যখন আমি থাকবো না
কি করবি রে বোকা...
শীতের সকাল
শীতের সকাল। সেবার এত শীত ছিলো যে গায়ের শীত নিরোধক হার মেনে বসেছে। ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছি এক চিলতে রোধের খোঁজে। বাইরে এসে দেখি উঠোন ভরে আছে নাম না জানা বট গাছটার শুকনো পাতায়। লোভ সামলাতে পারলাম না। দেয়াশালাই খোঁজে নিয়ে এলাম। ঝরা পাতাগুলো এক করে যেই আগুণ ধরাবো ঠিক তখুনি আব্বা শেইভিং কিডস্ নিয়ে বারান্দায় হাজির। তিনি বোধ হয় খোলা আকাশের নিচে শেভ করতে পছন্দ করতেন। কারণ তাকে আমি কখনও বাথরুমে শেভ করতে দেখিনি। সমস্যা হলো এখন যদি শুকনো পাতায় আগুণ দেই তাহলে আব্বা বকতে পারেন। প্রথমে ভাবলাম লুকিয়ে আগুণ দিয়ে দেই। যদি রাগ করেন তবে চম্পট দেব। পরে ঠিক করলাম বলে দেখি যদি অনুমতি পাওয়া যায়।
প্রত্যাশা করিনি। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে আব্বা সম্মতি দিলেন। যা সচরাচর তিনি করেন না। আমি মহাসুখে শুকনো পাতার শরীরে আগুণ দিলাম। আব্বা বারণ করে দিলেন- আগুণের বেশি কাছাকাছি যেন না যাই। কনকনে শীতের মাঝে আগুণের হাল্কা আঁচ যেন স্বর্গের পরশ বুলিয়ে দিতে লাগলো গায়ে। আমি বসে আছি উত্তাপের কাছে। মাঝে মাঝে হাতটাও বাড়িয়ে দিচ্ছিলাম আগুণের উত্তাপে। হঠাৎ কি হলো কে জানে! আমার পৃথিবীটা যেন কেঁপে উঠলো। ঝপসা হতে লাগলো চিরচেনা উঠোন ঘর আর একটু দূরে শেভরত বাবাও যেন ধোয়ার মধ্যে হারিয়ে যেতে লাগলেন। আমি বুঝতে পারছি আমি মাটিতে পড়ে যাচ্ছি। তারচেয়ে বড় কথা মাথা ঘুরে এবার আমি সোজা আগুণের মধ্যেই পড়তে যাচ্ছি। আমি চিৎকার করে আব্বাকে ডাকার চেষ্টা করলাম কিন্তু গলা দিয়ে একটা শব্দ বের করতে পারলাম না। আমি পড়ে যাচ্ছি। শেষবারের মতো ঝাপসা চোখে তাকালাম আব্বার দিকে। হঠাৎ দেখলাম আব্বার শরীরে বিদ্যুৎ খেলে গেলো। তিনি রেজার একদিকে আর ছোট্ট আয়নাটা ছুড়ে ফেলে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর আমার দিকে ছুটে আসতে লাগলেন। আমি চোখ বন্ধ করলাম।
(সেদিন অবশ্য বুঝিনি কেন হঠাৎ আমি মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিলাম। পরে জেনেছি কিংবা বুঝেছি আসলে বেশি কাছে থাকায় ধোয়া আমার নাক- মুখ দিয়ে ঢুকে যাওয়ায় শ্বাস-প্রশ্বাসে বিঘœ ঘটেছিলো। তখন আমি সবে কাস ফোর পড়–য়া। সেদিন ঝাপসা চোখে দেখা আব্বার সেই প্রাণপণ দৌড় এখনও চোখে ভাসে। আগের চেয়ে অনেক জীবন্ত।)
বালক বেলা
একবার আমার কি যেন একটা অসুখ হয়েছিলো। বালক বেলার কথা। ঠিক মনে নেই। তবে এই অসুখকে কেন্দ্র করে যে দুর্ঘটনা ঘটেছিলো সেটা বেশ মনে আছে।
আমাদের বাসার কাছাকাছিই এক এমবিবিএস ডাক্তারের বাসা ছিলো। আব্বা তাকেই ডেকে আনলেন বাসায়। তিনি আমাকে পরিা-টরিা করে ঔষুধ লিখে দিয়ে গেলেন। তার দেয়া ঔষধ আমাকে ঠিক পছন্দ করলো না। অর্থাৎ রিয়েক্শন করলো। এখন আমি না চাইলেও আমার মাথা আস্তে আস্তে ডান দিকে চলে যায়। সময়ের সাথে সেটা দ্রুত বাড়তে থাকে। একসময় এমন হলো যে দু’জন চেপে ধরেও মাথাকে সোজা রাখতে পারে না। ঔষুধ যে রিয়েকশন করেছে সেটা বুঝতে অবশ্য অনেক দেরি হয়েছিলো। আর ততণে আমার মনে হয়েছে এত কষ্টের চেয়ে মরে গেলে ভালো হতো।
আব্বা আমাকে নিয়ে একবার ডাক্তার তো একবার ডায়গনোস্টিক সেন্টার তো আবারও ডাক্তার। কিন্তু কেউ কোন রোগ ধরতে পারে না। কোন পথ না পেয়ে আব্বা শেষ আশ্রয়ের খুজে নিয়ে গিয়েছিলেন হযরত শাহ্জালাল (রা:) এর দরগা মসজিদের ইমাম সাহেবের কাছে। তখন আসরের আযান হয়নি। ইমাম সাহেব বাসায় বিশ্রাম নিচ্ছেন। আব্বা আমাকে নিয়ে সেখানে গেলেন। ইমাম সাহেব যেহেতু ঘুমে আমাদের আশ্রয় হলো বাসার বারান্দায় রাখা লম্বা ব্রেঞ্চে। আব্বা আমাকে ওখানে শুইয়ে দিলেন। তার কোলে মাথা রেখে আমি তখন যন্ত্রণায় ছটফট করছি। আর তখনই চোখ পড়ে আব্বার চোখের দিকে। আমি অবাক হয়ে দেখি তার চোখের জল গাল বেয়ে গড়িয়ে নেমে আসছে। আমি একসাথে অবাক হই, বিস্মিত হই, আনন্দিত এবং সেই সাথে বুকের কোথায় যেন একধরণের তীব্র ব্যথা অনুভব করি।
জন্মের পর এই প্রথম আমি আব্বাকে কাঁদতে দেখলাম।
আমার জন্য এখন আর কেউ কাঁদে না। বেশ মনে আছে আব্বা যেদিন মার যান সেদিন তার খুব শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল। আমি একটার পর একটা কিনিকে যোগাযোগ করছি। কিন্তু কেউ রাজি হচ্ছে না অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে আসতে। হঠাৎ মামা আমাকে ডেকে নিয়ে বলেন, ‘কি হবে আর দৌড়াদৌড়ি করে।’ মামা কি বলতে চাচ্ছেন আমার আর বুঝতে বাকি থাকলো না। আমার মনে হলো আকাশ আর মাটি এক হয়ে যাচ্ছে আর আমি তার মধ্যে চাপা পড়তে চলেছি। মাথার উপর থেকে হঠাৎ করেই যেন ছায়াটা সরে গেলো। এখন সেটা বেশ বুঝতে পারি। আমার জন্য কেউ আর এভাবে চোখের জল ফেলবে না। আব্বা কেমন আছো তুমি। আমাদের ছাড়া কেমন কাটে তোমার সময়। এমন টুকরো টুকরো স্মৃতি গুলোই তো এখন আমাদের বেঁচে থাকার অলম্বন। লেখা-পড়ায় কাঁচা, সহজ-সরল ছেলেকে নিয়ে আব্বার চিন্তার শেষ ছিলো না। প্রায়ই বলতেন আমি মরে গেলে যে তোর কি হবে। আব্বা তুমি জানো না তোমার ছেলে এখন অনেক বড় হয়ে গেছে। বাস্তবতার কঠিন পথে পা হুচট খেতে খেতে সে শিখে ফেলছে কিভাবে হাঁটতে হয়।
Saturday, June 16, 2007
Subscribe to:
Posts (Atom)